দশটি বই,
দশটি পৃথিবী, আর বাংলা জীবনের অসংখ্য মুখ
জীবনে কত বই পড়া যায়?
হাজার? পাঁচশো? একশো?
শেষ পর্যন্ত
সংখ্যাটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ কিছু বই আমরা পড়ি, আর কিছু বই আমাদের ভিতরে থেকে যায়। কোনো একটি চরিত্রের মুখ, কোনো নদীর গন্ধ, কোনো বিকেলের আলো, কোনো
অসমাপ্ত প্রেম, কোনো গ্রামের
পথ, কোনো ঘরের নিঃশব্দ কান্না বহু বছর
পরেও হঠাৎ মনে পড়ে যায়। তখন বুঝি, বইটি
আসলে আমরা পড়িনি। বইটি আমাদের পড়েছে।
বাংলা
সাহিত্যের সৌভাগ্য, এমন বইয়ের অভাব
এখানে কখনও ছিল না।
বাংলা
উপন্যাসের পরিসর এত বিশাল যে দশটি বই দিয়ে তাকে ধরার চেষ্টা প্রায় অসম্ভব।
বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র
থেকে বিভূতিভূষণ, মানিক থেকে
তারাশঙ্কর, অদ্বৈত
মল্লবর্মণ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়—প্রতিটি লেখকই আমাদের অন্য একটি জানালা খুলে
দিয়েছেন। বাংলা উপন্যাস কখনও আমাদের নিয়ে গেছে নদীর ধারে, কখনও অরণ্যের গভীরে, কখনও
কলকাতার অন্ধকার গলিতে, কখনও ইতিহাসের
উত্তাল সময়ে, কখনও বা
মানুষের নিজের মনের এমন একটি ঘরে, যেখানে
সে নিজেও সবসময় প্রবেশ করতে সাহস পায় না।
তাই এই
তালিকাকে “সর্বকালের সেরা দশ” বলে দাবি করছি না। এটি বরং মৃত্যুর আগে অন্তত একবার পড়ে দেখতে চাই এমন দশটি
বাংলা উপন্যাসের ব্যক্তিগত পাঠতালিকা।
কেউ হয়তো বলবেন,
অমুক নেই কেন? কেউ প্রশ্ন তুলবেন, তমুককে
বাদ দেওয়া হল কীভাবে?
সেটা
স্বাভাবিক।
ভালো বইয়ের
তালিকা নিয়ে তর্ক না হলে বাঙালির বইপড়া সম্পূর্ণ হয় না!
তাহলে চলুন,
বইয়ের তাক থেকে দশটি দরজা খুলে দেখি।
১. পথের
পাঁচালী — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
যে বই আপনাকে
নিজের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে
বাংলা
সাহিত্যের এমন একটি বই যদি বেছে নিতে বলা হয়, যা একই সঙ্গে দারিদ্র্য, শৈশব,
প্রকৃতি, স্বপ্ন
এবং হারানোর বেদনা ধারণ করে, তবে
আমার প্রথম পছন্দ হবে পথের পাঁচালী।
অপু ও দুর্গাকে
আমরা শুধু একটি দরিদ্র পরিবারের দুই সন্তান হিসেবে দেখি না। তাদের চোখ দিয়ে আমরা
দেখতে শিখি এক পৃথিবীকে—যেখানে রেলগাড়ি এখনও বিস্ময়, কাশফুলের মাঠ এখনও আনন্দের, আম
কুড়োনো এখনও অভিযান, আর বৃষ্টিভেজা
বিকেলও হতে পারে এক সম্পূর্ণ উৎসব।
কিন্তু এই
সৌন্দর্যের ভিতরেই আছে অভাব। আছে অনিশ্চয়তা। আছে মৃত্যুর ছায়া।
বিভূতিভূষণের
অসাধারণত্ব এখানেই। তিনি দারিদ্র্যকে কেবল করুণ করে দেখাননি। সেই জীবনের মধ্যেও যে
হাসি আছে, কৌতূহল আছে, প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক আছে, তা দেখিয়েছেন।
এই উপন্যাস
পড়তে পড়তে কখনও মনে হবে আপনি অপুকে দেখছেন। কখনও মনে হবে আপনি নিজেই সেই ছোট্ট
ছেলে বা মেয়েটি, যে বৃষ্টির পরে
কাদামাটির পথে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে আছে।
কেন পড়বেন?
কারণ এই বই আপনাকে শেখাবে, জীবনের বড় আনন্দগুলি সবসময় বড় জিনিস থেকে আসে না।
কাকে উপহার
দেবেন?
যে মানুষটি মনে করেন তাঁর শৈশব অনেক দূরে চলে
গেছে।
২. চোখের বালি
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চারজন মানুষের
সম্পর্কের মধ্যে যে অদৃশ্য আগুন
রবীন্দ্রনাথকে
আমরা প্রায়ই কবি হিসেবে স্মরণ করি। কিন্তু চোখের বালি পড়লে মনে হয়, মানুষের মনস্তত্ত্বের কত গভীরে তিনি প্রবেশ করেছিলেন!
বিনোদিনী,
মহেন্দ্র, আশালতা এবং বিহারী—চারটি মানুষ। চারটি আকাঙ্ক্ষা। চারটি অসম্পূর্ণতা।
বিধবা
বিনোদিনীকে রবীন্দ্রনাথ স্রেফ “ভালো” বা “খারাপ” নারী হিসেবে আঁকেননি। তাঁর আছে
বুদ্ধি, সৌন্দর্য, আকাঙ্ক্ষা, অভিমান,
ঈর্ষা এবং নিজের জীবনের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার
তীব্র বাসনা।
এই কারণেই চোখের বালি আজও পুরোনো মনে হয় না।
সমাজ বদলেছে।
পোশাক বদলেছে। যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু সম্পর্কের ভিতরে যে ঈর্ষা, আকর্ষণ, নিরাপত্তাহীনতা
এবং ভালোবাসা কাজ করে, তা কি সত্যিই
বদলেছে?
হয়তো খুব বেশি
নয়।
কেন পড়বেন?
কারণ এটি শুধু একটি সম্পর্কের গল্প নয়; এটি মানুষের ইচ্ছা এবং সামাজিক বিধিনিষেধের
সংঘর্ষের গল্প।
আর একটি কথা—এই
বই পড়ার পরে বিনোদিনীকে সহজে বিচার করতে পারবেন না।
৩. শ্রীকান্ত —
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
যে উপন্যাসের
আসল নায়ক হয়তো পথ নিজেই
শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত আমার কাছে শুধু একটি উপন্যাস নয়,
এক দীর্ঘ ভ্রমণ।
শ্রীকান্ত ঘুরে
বেড়ায়। মানুষ দেখে। সম্পর্ক দেখে। প্রেম দেখে। সমাজের নানা স্তরের মানুষের
সংস্পর্শে আসে। আর সেইসব মানুষের মধ্য দিয়ে নিজেকেও চিনতে থাকে।
এই উপন্যাসের
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার চরিত্রগুলি।
রাজলক্ষ্মীকে
কি ভুলে থাকা যায়?
অভয়া?
কমললতা?
শ্রীকান্তের
জীবনে আসা মানুষগুলি যেন আলাদা আলাদা নদী। প্রত্যেকের নিজস্ব স্রোত, নিজস্ব গন্তব্য।
শরৎচন্দ্রের
ভাষা সহজ। কিন্তু সহজ ভাষা মানেই সরল সাহিত্য নয়। তাঁর বাক্যের ভিতরে যে মানবিক
পর্যবেক্ষণ, সেটাই তাঁকে এত
জনপ্রিয় করে রেখেছে।
শ্রীকান্ত পড়তে পড়তে আপনার নিজের জীবনের
মানুষগুলির কথাও মনে পড়তে পারে—যারা এসেছিল, কিছুদিন ছিল, তারপর
চলে গিয়েছিল; কিন্তু
সম্পূর্ণ চলে যায়নি কখনও।
কেন পড়বেন?
কারণ এটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে—জীবন আসলে কোনো
একটি গন্তব্য নয়। জীবন অনেকগুলি মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার নাম।
৪. আরণ্যক —
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বনকে ভালোবাসতে
শিখিয়ে যে বই আমাদের সভ্যতাকে প্রশ্ন করে
আরণ্যক পড়ার পর জঙ্গলকে আর শুধু গাছের
সমষ্টি বলে মনে হয় না।
সত্যচরণ যখন
অরণ্যে যায়, সে একটি কাজের
প্রয়োজনে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে বন তার কাছে হয়ে ওঠে এক জীবন্ত পৃথিবী। সেখানে
মানুষ আছে, প্রান্তিক
মানুষ আছে, জমি আছে,
গাছ আছে, পশুপাখি
আছে, স্বপ্ন আছে, আবার ধ্বংসও আছে।
এই উপন্যাসের
সবচেয়ে বেদনাদায়ক জায়গাগুলির একটি হল—মানুষ যখন সভ্যতা নির্মাণ করতে যায়, তখন সে অজান্তেই অন্য একটি পৃথিবী ধ্বংস করে
ফেলে।
আজকের পরিবেশ
সংকটের সময়ে আরণ্যক পড়লে বইটির বয়স যেন হঠাৎ কমে যায়।
এটি শুধু
প্রকৃতির উপন্যাস নয়। এটি মানুষের লোভ, অপরাধবোধ,
নিঃসঙ্গতা এবং প্রকৃতির প্রতি তার দায়ের উপন্যাস।
কেন পড়বেন?
একদিন শহরের জানালা দিয়ে গাছের দিকে তাকিয়ে যদি
আপনার মনে হয়, “এই গাছটি কি
আমাকে চেনে?”—তাহলে বুঝবেন,
আরণ্যক আপনার ভিতরে ঢুকে গেছে।
৫. পদ্মা নদীর
মাঝি — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
নদী এখানে শুধু
নদী নয়—একটি নিয়তি
পদ্মার জল কখনও
শান্ত। কখনও ভয়ংকর। কখনও জীবন দেয়। কখনও জীবন কেড়ে নেয়।
মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা
নদীর মাঝি-তে নদী শুধু
পটভূমি নয়। নদী যেন নিজেই একটি চরিত্র।
কুবের এবং তার
মতো অসংখ্য জেলের জীবন—দারিদ্র্য, ক্ষুধা,
আকাঙ্ক্ষা, যৌনতা, প্রেম, অসহায়তা এবং বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম—মানিক
এমন নির্মম বাস্তবতায় এঁকেছেন যে পাঠক অনেক সময় অস্বস্তি বোধ করবেন।
এটাই এই
উপন্যাসের শক্তি।
এখানে গরিব
মানুষকে দূর থেকে দেখে করুণা করার সুযোগ নেই। আপনি তাদের জীবনের ভিতরে ঢুকে পড়বেন।
আর হোসেন মিয়ার
ময়নারদ্বীপের স্বপ্ন? সেটি কি
মুক্তির স্বপ্ন, নাকি আরেকটি
ফাঁদ?
এই প্রশ্নটি বই
শেষ হওয়ার পরেও থেকে যায়।
কেন পড়বেন?
কারণ মানুষের ক্ষুধা ও স্বপ্নের মধ্যে যে সম্পর্ক,
বাংলা সাহিত্যে তার এত তীব্র ছবি খুব কম বইতেই
পাওয়া যায়।
৬. হাঁসুলি
বাঁকের উপকথা — তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
একটি নদী,
একটি বাঁক, আর বদলে যেতে থাকা এক পৃথিবী
কোপাই নদীর
বাঁকে বসবাসকারী কাহার সম্প্রদায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলি বাঁকের
উপকথা।
নামেই যেন একটি
লোককথার গন্ধ আছে।
কিন্তু এটি
শুধু লোককথা নয়। এটি পরিবর্তনের গল্প।
একটি সমাজ
নিজের বিশ্বাস, ভয়, প্রথা এবং অভ্যাস নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকে,
আর বাইরের পৃথিবীর পরিবর্তন যখন সেই জীবনকে আঘাত
করে তখন কী ঘটে—তারাশঙ্কর সেই সংঘাতকে অসাধারণ শক্তিতে ধরেছেন।
এই উপন্যাস
পড়লে “উন্নয়ন” শব্দটির অন্য একটি অর্থও মনে আসে।
কারও কাছে নতুন
রাস্তা, নতুন প্রযুক্তি, নতুন কাজ মানে অগ্রগতি। কিন্তু অন্য কারও কাছে
সেটিই হয়তো তার বহু প্রজন্মের জীবনযাত্রার শেষ ঘণ্টা।
কেন পড়বেন?
কারণ বাংলা গ্রামকে শুধু সুন্দর সবুজ দৃশ্য
হিসেবে দেখতে চাইলে এই বই পড়বেন না। মানুষসহ একটি সম্পূর্ণ সমাজকে দেখতে চাইলে
পড়ুন।
৭. তিতাস একটি
নদীর নাম — অদ্বৈত মল্লবর্মণ
একটি নদী
শুকিয়ে গেলে শুধু জল শুকোয় না
বাংলা সাহিত্যে
নদী নিয়ে বহু লেখা হয়েছে। কিন্তু তিতাস একটি নদীর নাম-এর মতো
করে নদী এবং মানুষের অস্তিত্বকে একসঙ্গে বেঁধে দেওয়া বই খুব বেশি নেই।
অদ্বৈত
মল্লবর্মণের এই উপন্যাস তিতাস নদীর তীরবর্তী মালো জেলেদের জীবনকে কেন্দ্র করে
নির্মিত। বইটি প্রথমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং পরে ১৯৫৬ সালে গ্রন্থাকারে
প্রকাশিত হয়; পরবর্তীকালে
ঋত্বিক ঘটকের বিখ্যাত চলচ্চিত্রও এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়।
কিন্তু বইটি
পড়ার সময় এগুলি ইতিহাস হয়ে যায়।
আপনি দেখতে
পাবেন মানুষ কীভাবে নদীর সঙ্গে জন্মায়, নদীর
সঙ্গে কাজ করে, নদীর উপর
নির্ভর করে, ভালোবাসে,
স্বপ্ন দেখে। আর যখন নদী বদলে যায়, তখন তাদের জীবনও বদলে যায়।
এখানে ব্যক্তির
গল্প আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি
সম্প্রদায়ের গল্প।
কেন পড়বেন?
কারণ এই বই আপনাকে বুঝতে শেখাবে—ভূগোল কখনও শুধু
মানচিত্রের বিষয় নয়। একটি নদী একটি মানুষের সংস্কৃতি, পেশা, স্মৃতি এবং
অস্তিত্ব হয়ে উঠতে পারে।
৮. সেই সময় —
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
উনিশ শতকের
কলকাতা যেন আপনার চোখের সামনে হাঁটতে শুরু করবে
ইতিহাসের বই
পড়লে আমরা সাল, যুদ্ধ, সংস্কার, আন্দোলন
এবং বিখ্যাত মানুষের নাম জানতে পারি।
কিন্তু সেই সময় পড়লে ইতিহাসের ভিতরে মানুষকে দেখতে
পাই।
সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের এই বিশাল উপন্যাস উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের সময়কে জীবন্ত করে
তোলে। বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কাল্পনিক চরিত্রকে মিলিয়ে তিনি এমন এক
জগৎ তৈরি করেছেন, যেখানে পাঠক
শুধু ইতিহাস “জানেন” না—ইতিহাসের মধ্যে হাঁটেন।
মাইকেল মধুসূদন,
বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র—তাঁরা আর পাঠ্যবইয়ের দূরের মানুষ থাকেন না।
তাঁদের সময়ের
কলকাতা, সমাজ, প্রেম, দ্বন্দ্ব,
উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সংস্কার এবং পরিবর্তন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
কেন পড়বেন?
কারণ নিজের সময়কে বুঝতে হলে কখনও কখনও অতীতে ফিরে
তাকাতে হয়।
আর বাংলা
নবজাগরণকে যদি শুধু পরীক্ষার উত্তর হিসেবে না দেখে একটি জীবন্ত সময় হিসেবে জানতে
চান, সেই সময় অসাধারণ একটি যাত্রা।
৯. ন হন্যতে —
মৈত্রেয়ী দেবী
কিছু প্রেমের
শেষ হয় না, শুধু তাদের
ভাষা বদলে যায়
ন হন্যতে অন্যরকম একটি বই।
এটি প্রেমের
গল্প, কিন্তু শুধুই প্রেমের গল্প নয়।
স্মৃতি,
সংস্কৃতি, বিচ্ছেদ, সময় এবং
মানুষের ভিতরে থেকে যাওয়া সম্পর্ক—সব মিলিয়ে মৈত্রেয়ী দেবী এই উপন্যাসে এমন এক
আবেগের জগৎ তৈরি করেছেন, যেখানে
অতীত কখনও পুরোপুরি অতীত হয়ে যায় না।
প্রেমের স্মৃতি
বয়সের সঙ্গে কীভাবে বদলে যায়?
যে মানুষটি বহু
বছর আগে চলে গেছে, সে কি সত্যিই
চলে যায়?
নাকি আমাদের
ভিতরের কোনো একটি ঘরে সে থেকে যায়?
এই প্রশ্নগুলিই ন হন্যতে-কে অন্যরকম করে তোলে।
এটি তাদের জন্য
বিশেষ একটি বই, যারা মনে করেন
জীবনের কিছু সম্পর্ককে যুক্তি দিয়ে শেষ করা যায় না।
কেন পড়বেন?
কারণ জীবনে কিছু মানুষকে আমরা হারাই, কিন্তু তাদের সঙ্গে কাটানো সময়কে হারাতে পারি না।
১০. গোরা —
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
“আমি কে?”—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যে উপন্যাস
শেষ বইটি
হিসেবে আমি আবার রবীন্দ্রনাথের কাছেই ফিরছি।
কারণ গোরা শুধু একটি উপন্যাস নয়; এটি পরিচয়ের একটি দীর্ঘ যাত্রা।
ধর্ম কী?
জাতি কী? দেশ কী?
জাতীয়তাবাদ কী? একজন মানুষকে কী দিয়ে চেনা যায়?
জন্ম দিয়ে?
ধর্ম দিয়ে?
জাত দিয়ে?
নাকি তার
মানবিকতা দিয়ে?
গোরার নিজের
পরিচয়কে ঘিরে যে গভীর সংকট তৈরি হয়, তা শেষ
পর্যন্ত ব্যক্তিগত সংকটের সীমা ছাড়িয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, সমাজ এবং মানবতার প্রশ্নকে একসঙ্গে নিয়ে আসেন।
এক শতাব্দীরও
বেশি আগে লেখা হলেও আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নগুলি অদ্ভুতভাবে সমকালীন মনে
হয়।
কেন পড়বেন?
কারণ জীবনের কোনো এক সময়ে আমাদের প্রত্যেককেই
নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করতে হয়।
আর তখন হয়তো
বুঝতে পারি, আমরা নিজেদের
সম্পর্কে যে গল্পটি এতদিন বলে এসেছি, সেটিই
সম্পূর্ণ সত্য নয়।
তাহলে কোনটি
দিয়ে শুরু করবেন?
যদি বাংলা
উপন্যাসে একেবারেই নতুন হন, আমি
বলব পথের
পাঁচালী দিয়ে
শুরু করুন।
যদি প্রেম এবং
সম্পর্ক আপনার বেশি ভালো লাগে, পড়ুন চোখের বালি বা ন হন্যতে।
যদি মানুষের
জীবনসংগ্রাম আপনাকে টানে, হাতে
নিন পদ্মা
নদীর মাঝি।
প্রকৃতি ও
মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে চাইলে আরণ্যক।
ইতিহাসের ভিতর
দিয়ে হাঁটতে চাইলে সেই সময়।
আর যদি এমন
একটি বই চান, যার পাতা বন্ধ
করার পরেও মনে হবে আপনি যেন একটি নদীর তীরে বসে আছেন, তাহলে তিতাস একটি নদীর নাম।
আর শ্রীকান্ত?
সেটি তাদের
জন্য, যারা এখনও মনে মনে একটু পথিক।
আমার বইয়ের তাক
থেকে আপনার বইয়ের তাক পর্যন্ত
একটি ভালো
বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেকটা পুরোনো বন্ধুত্বের মতো।
প্রথমবার পড়ার
সময় আমরা বইটিকে বুঝি।
দশ বছর পরে
আবার পড়লে বুঝি, আসলে বইটি
আমাদেরই বুঝেছিল।
আজ যে পথের পাঁচালী-তে অপু ও দুর্গাকে দেখছি, দশ বছর পরে হয়তো সেখানে নিজের শৈশবকে দেখব। শ্রীকান্ত-এ আজ যে ভবঘুরে মানুষটিকে ভালো লাগছে, বয়স বাড়লে হয়তো তার একাকিত্ব বুঝব। চোখের বালি-র বিনোদিনীকে আজ যে চোখে দেখছি, কয়েক বছর পরে হয়তো তার বিচার বদলে যাবে।
এই কারণেই কিছু
বই বারবার পড়া যায়।
কারণ বই বদলায়
না।
আমরাই বদলাই।
তাই মৃত্যুর
আগে দশটি বাংলা উপন্যাস পড়ার এই তালিকাটি আসলে মৃত্যুর কথা বলার তালিকা নয়।
এটি বেঁচে
থাকার তালিকা।
দশটি বই।
দশটি দরজা।
আর প্রতিটি
দরজার ওপারে বাংলা জীবনের অন্য একটি পৃথিবী।
আপনার হাতে যদি
আজ একটি বই তুলে দেওয়ার সুযোগ পাই, আমি
হয়তো বলব—
“পড়ুন। তাড়াহুড়ো
করবেন না। বইটি শেষ করার চেয়ে বইটির ভিতরে কিছুদিন বেঁচে থাকুন।”
📚 আপনার পরের পাঠ কোনটি?
এই দশটির মধ্যে
আপনি কতগুলি পড়েছেন?
আর আপনার মতে “মৃত্যুর আগে
অবশ্যই পড়তে হবে” এমন কোন বাংলা উপন্যাসটি এই তালিকায় থাকা উচিত ছিল?
কমেন্টে আপনার
পছন্দের বইটির নাম লিখুন।
হয়তো পরের তালিকাটি তৈরি হবে আপনাদের পছন্দ
থেকেই।
🛒 বইগুলি কিনে পড়তে চাইলে
১. পথের পাঁচালী — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
📖 পথের পাঁচালী পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
২. চোখের বালি
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
📖 চোখের বালি পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
৩. শ্রীকান্ত —
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
📖 শ্রীকান্ত পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
৪. আরণ্যক —
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
📖 আরণ্যক পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
৫. পদ্মা নদীর
মাঝি — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
📖 পদ্মা নদীর মাঝি পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
৬. হাঁসুলি
বাঁকের উপকথা — তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
📖 হাঁসুলি বাঁকের উপকথা পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
৭. তিতাস একটি
নদীর নাম — অদ্বৈত মল্লবর্মণ
📖 তিতাস একটি নদীর নাম পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
৮. সেই সময় —
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
📖 সেই সময় পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
৯. ন হন্যতে —
মৈত্রেয়ী দেবী
📖 ন হন্যতে পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
১০. গোরা —
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
📖 গোরা পড়তে চাইলে:
🛒
[Amazon-এ বইটি দেখুন] | [Flipkart-এ বইটি দেখুন]
দাম ও উপলব্ধ edition দেখে আপনার পছন্দেরটি বেছে নিন।
📚 বই পড়ার আনন্দ আরও একটু সুন্দর করে তুলুন
বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এই সুন্দর magnetic bookmarks-টি দেখতে পারেন।
[Book Magnet দেখুন- Amazon / Flipkart]
এই লিঙ্কগুলির মাধ্যমে বই কিনলে আমার ব্লগটি সামান্য কমিশন পেতে পারে, আপনার অতিরিক্ত কোনো খরচ ছাড়াই। আপনার একটি বই কেনা একজন স্বাধীন লেখক ও ব্লগারকে আরও লিখতে উৎসাহ দেয়।
বাংলা সাহিত্য |
বই | ভ্রমণ | সিনেমা
| সঙ্গীত | স্মৃতি ও মানুষের গল্প
Susmita Blogs — যেখানে
বই শুধু পড়া হয় না, জীবনের
সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
লেখক পরিচিতি
সুস্মিতা মুখার্জি একজন ভারতীয় লেখক এবং আর্মি পাবলিক স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষিকা। কলকাতায় বসবাসকারী এই লেখকের সাহিত্যচর্চায় বারবার ফিরে আসে শ্রম, মানুষের লড়াই, প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার শক্তি এবং মানবসম্পর্কের কোমল ও জটিল দিকগুলি।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখালেখিকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা। তিনি প্রশিক্ষিত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী; পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা ও হসপিটালিটি শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর দীর্ঘ কর্ম-অভিজ্ঞতা রয়েছে। শিক্ষকতা, শিক্ষা-সমন্বয়, কর্পোরেট যোগাযোগ এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় মানুষকে কাছ থেকে দেখার এক বিশেষ সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে।
তাঁর গল্প ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়েছে Indian Literature (Sahitya Akademi), Muse India, Intrepidus Ink, Flash Fiction Magazine, Fractured Lit, Sky Island Journal, NUNUM Magazine, BULL Lit, Kitaab, Setu, Epistemic Literary Magazine, Gulmohur Quarterly, The Fictive Dream, Literally Stories, Literary Yard এবং Shabdodweep Web Magazine-সহ ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায়।
তিনি Flash Fiction Magazine-এর প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। এছাড়াও Inkspot Short Story Competition 2025–26 এবং 3 Minute Arts Story Writing Competition 2025–26-এ দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ When the Earth Sang of Us: A Meditation on Love, Life and Nature প্রেম, জীবন, প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানবিক অনুভবকে কেন্দ্র করে রচিত এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পাঠকদের জন্য উপলব্ধ।
সুস্মিতা মুখার্জির লেখার কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবন, তাদের নীরব সংগ্রাম, হারানো ও ফিরে পাওয়ার স্মৃতি, সম্পর্কের সূক্ষ্ম জটিলতা এবং জীবনের প্রতি গভীর মানবিক কৌতূহল। তাঁর কাছে লেখা শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়; লেখা মানুষকে একটু কাছ থেকে দেখা, তাদের না-বলা কথাগুলি শোনা এবং সময়ের ভেতরে হারিয়ে যেতে বসা ছোট ছোট জীবনের চিহ্ন ধরে রাখার একটি প্রয়াস।
Follow Susmita Mukherjee
· X
· Facebook
0 Comments