কখনও কখনও দুটি
নাটক আলাদা সময়ে দেখা হলেও পরে মনে হয়, তারা
যেন নিজেদের মধ্যে একটি অদৃশ্য কথোপকথন তৈরি করেছে। নান্দীকারের অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ এবং পঞ্চাজন্য আমার কাছে তেমনই দুটি নাটক। প্রথমটি
দেখেছিলাম ১৬ আগস্ট, অ্যাকাডেমি অফ
ফাইন আর্টসে। সপ্তর্ষি মৌলিকের লেখা এবং সোহিনী সেনগুপ্তের নির্দেশনায় নাটকটি
আমাকে ভাবিয়েছিল স্বাধীন চিন্তা, শিক্ষা,
সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং বিজ্ঞান ও শিল্পের সম্পর্ক
নিয়ে। প্রায় এক মাস পরে, ১৪
সেপ্টেম্বর, গণেশ চতুর্থীর
সন্ধ্যায়, আবার সেই অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসেই
গিয়ে দেখলাম পঞ্চাজন্য। পার্থপ্রতিম দেবের লেখা এবং সোহিনী সেনগুপ্তের নির্দেশনায় এই নাটক
মহাভারতের কৃষ্ণকে অন্য এক আলোয় দেখতে শেখাল—দেবতা হিসেবে নয় শুধু, একজন মানুষ হিসেবে, যাঁর উপর দায়িত্বের ভার এতটাই বেশি যে তাঁর নিজের ইচ্ছা, ব্যক্তিগত সুখ এবং ভালোবাসার জায়গাগুলি ক্রমশ
পিছিয়ে যায়।
দুটি নাটকের
বিষয় আলাদা, সময় ও পরিসরও
আলাদা, কিন্তু দুটির ভিতরেই আমি একটি মিল
খুঁজে পেয়েছি। দুটিই আসলে মানুষের নিজের জীবন নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার অধিকার
এবং সেই অধিকারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দায়িত্বের কথা বলে। অবাঞ্ছিত শব্দগুচ্ছ প্রশ্নটি তোলে একটি তরুণ মানুষের সামনে—সে কী
পড়বে, কী হবে, কোন পথ বেছে নেবে, সেটি
কি অন্য কেউ তার হয়ে ঠিক করে দিতে পারে? পঞ্চাজন্য একই প্রশ্নটিকে আরও গভীরে নিয়ে যায় কৃষ্ণের জীবনের সামনে—একজন মানুষ
যদি বৃহত্তর দায়িত্বের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন, তাহলে তাঁর নিজের জীবন, তাঁর
ব্যক্তিগত চাওয়া এবং তাঁর স্বাধীনতার জায়গাটি কোথায় থাকে?
সপ্তর্ষি
মৌলিকের লেখা অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ প্রথম
দেখাতেই আমার কাছে অত্যন্ত সমকালীন একটি নাটক বলে মনে হয়েছিল। নাটকের পটভূমি একটি
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, যেখানে একাদশ
শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জীবনের সামনে এসে দাঁড়ায় বাংলা ভাষা,
সাহিত্য, কবিতা
এবং শিল্পের আর-একটি সম্ভাবনা। প্রকাশিত আলোচনায়ও নাটকটির কেন্দ্র হিসেবে
বিজ্ঞানপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বাংলা ভাষা ও শিল্পবোধের এই সম্পর্কটির কথা উঠে
এসেছে।
আমাদের সমাজে
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা-মায়ের উদ্বেগ খুব স্বাভাবিক। প্রত্যেক বাবা-মাই চান
তাঁদের সন্তান নিরাপদ থাকুক, ভালো
করুক, প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু সেই চাওয়ার
ভিতরেই কখনও কখনও এমন একটি নিয়ন্ত্রণ ঢুকে পড়ে, যেখানে সন্তানের নিজের পছন্দ, কৌতূহল,
প্রতিভা এবং স্বপ্নের জায়গাটি ক্রমশ ছোট হয়ে যায়।
তাকে বলা হয় কোন বিষয়টি “ভালো”, কোন
পেশাটি “নিরাপদ”, কোন পথে গেলে
ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে। কিন্তু একজন তরুণ মানুষ কি শুধুই ভবিষ্যতের একটি পেশা?
তার কি নিজের মতো করে কিছু ভালো লাগতে পারে না?
সে কি এমন কোনও বিষয় নিয়ে ভাবতে পারে না, যার সরাসরি অর্থনৈতিক মূল্য নেই? আর সবচেয়ে বড় কথা, তার নিজের জীবন সম্পর্কে তার নিজের মতামতের জায়গাটি কোথায়?
এই প্রশ্নগুলিই অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ খুব
সহজ কিন্তু তীক্ষ্ণভাবে সামনে আনে। আমার কাছে নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি
ছিল এখানেই—সন্তানের ভাল চাওয়া এবং সন্তানের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যে যে সূক্ষ্ম
পার্থক্য, সেটি আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না।
“তোমার ভালর জন্যই বলছি” কথাটি নিঃসন্দেহে ভালোবাসা থেকে আসতে পারে, কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি সন্তানের নিজের
সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়, তাহলে
তার মধ্যে একটি অদৃশ্য শৃঙ্খল তৈরি হয়। তখন সে হয়তো সফল হবে, কিন্তু সে কি নিজের মতো করে বাঁচবে?
নাটকটির নাম অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ বলেই
হয়তো এত অর্থবহ মনে হয়। যে শব্দ, যে
প্রশ্ন, যে ভাবনাকে আমরা অপ্রয়োজনীয় বলে
সরিয়ে রাখতে চাই, সেটিই কখনও
কখনও নতুন চিন্তার শুরু হতে পারে। একটি শিশু বা তরুণ যখন প্রচলিত পথ নিয়ে প্রশ্ন
করে, তখন আমরা তাকে অবাধ্য বলি; যখন সে বলে অন্য কিছু করতে চায়, তখন আমরা তাকে বাস্তববাদী হতে বলি; যখন সে নিজের পছন্দের দিকে যেতে চায়, তখন আমরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখাই। অথচ পরে সেই
মানুষটি যদি নিজের মতো কিছু সৃষ্টি করতে পারে, তখন আমরা তার স্বাধীন চিন্তাকেই তার প্রতিভা বলে স্বীকার করি। এই
বৈপরীত্যটি নাটকটি আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে।
বিজ্ঞান ও
শিল্পের মাঝখানে মানুষ
নাটকের আর-একটি
গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিজ্ঞান এবং শিল্পকে আমরা যেভাবে দুটি আলাদা জগত হিসেবে দেখতে
অভ্যস্ত, সেই ধারণাকে প্রশ্ন করা। বিজ্ঞান
আমাদের যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং
অনুসন্ধান শেখায়; শিল্প আমাদের
অনুভব করতে, কল্পনা করতে
এবং মানুষের ভিতরের জগতকে বুঝতে সাহায্য করে। একজন বিজ্ঞানীর কল্পনাশক্তির প্রয়োজন
নেই, আর একজন শিল্পীর যুক্তিবোধের প্রয়োজন
নেই—এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। বরং একজন সম্পূর্ণ মানুষের মধ্যে এই দুই প্রবণতার
সহাবস্থানই তাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
সপ্তর্ষি
মৌলিকের বক্তব্যেও এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—একটি নির্দিষ্ট পথে অনেক
মানুষ গেছে বলেই সেই পথ প্রত্যেকের জন্য সঠিক হয়ে যায় না। এই ভাবনাটি নাটকের ভিতরে থাকলেও আমার মনে হয়েছে,
এটি শ্রেণিকক্ষের বাইরে আরও অনেক দূর পর্যন্ত
যায়। আমরা শুধু সন্তানদের ক্ষেত্রেই নয়, নিজেদের
জীবনেও কতবার অন্যের তৈরি “সঠিক” পথ অনুসরণ করি। কখনও পরিবার, কখনও সমাজ, কখনও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কখনও
সম্পর্কের দায় আমাদের নিজের ইচ্ছাটিকে একটু একটু করে পিছিয়ে দেয়। আমরা ভাবি,
এখন নয়, পরে
নিজের জন্য বাঁচব। কিন্তু সেই “পরে” কখনও কখনও আর আসে না।
এই জায়গাতেই
নাটকটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়েছে। কারণ স্বাধীনতা শুধু বড় কোনও রাজনৈতিক শব্দ
নয়। স্বাধীনতা অনেক সময় খুব ছোট একটি জায়গা—আমি কী পড়তে চাই, কী গান শুনতে চাই, কী লিখতে চাই, কোন
কাজ করতে চাই, কোন মানুষটির
সঙ্গে সময় কাটাতে চাই, কিংবা জীবনের
কোন পথে হাঁটতে চাই। সেই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলির উপর নিজের অধিকারটুকুও মানুষের
স্বাধীনতার অংশ।
অভিনয় ও সোহিনী
সেনগুপ্তের নির্দেশনা
মঞ্চে সকল
শিল্পীর অভিনয় আমার কাছে এক কথায় দুর্দান্ত লেগেছে। শরীরী ভাষা, সংলাপ প্রক্ষেপণ এবং দলগত অভিনয় নাটকটিকে
প্রাণবন্ত করে তুলেছে। একটি শ্রেণিকক্ষের মতো পরিচিত ও সীমিত পরিসরের মধ্যে এতগুলি
চরিত্রকে সক্রিয় রাখা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ক্রমশ নাটকের মূল ভাবনার
সঙ্গে যুক্ত করা সহজ কাজ নয়। নান্দীকারের দলগত অভিনয়ের শক্তি এখানে যথেষ্ট স্পষ্ট।
সোহিনী
সেনগুপ্তের নির্দেশনার একটি দিক আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছে—নাটকটি দর্শকের সামনে
একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে প্রশ্ন করার জায়গাটি তৈরি করে।
প্রকাশিত আলোচনায় সোহিনীও দর্শকদের ভাবার ও আলোচনা করার সুযোগ দেওয়ার কথাই বলেছেন। আমার কাছে এটিই একটি সফল
নাট্যনির্দেশনার লক্ষণ। মঞ্চ থেকে যদি শুধু বলা হয় কী ভাবতে হবে, তাহলে নাটক শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাবনাটিও শেষ
হয়ে যায়। কিন্তু একটি নাটক যদি দর্শককে নিজের জীবনের সঙ্গে প্রশ্নটিকে মিলিয়ে
দেখতে বাধ্য করে, তাহলে তার
প্রভাব মঞ্চের বাইরেও থেকে যায়।
১৬ আগস্ট অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ দেখে
অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমার মনে মূলত সেই প্রশ্নটাই
ছিল—আমরা আমাদের সন্তানদের সত্যিই নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে দিই তো? নাকি তাদের জন্য ভালো কিছু করতে গিয়ে অজান্তেই
তাদের জীবনের একটি অংশ নিজেদের হাতে নিয়ে নিই?
তারপর প্রায় এক
মাস কেটে গেল।
১৪ সেপ্টেম্বর
আবার সেই একই প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বসেছিলাম। এবার সামনে অন্য এক জগৎ।
নাটক চলাকালীন ছবি তোলার সুযোগ ছিল না” কথাটি রাখা ভালো—এতে পাঠক বুঝবেন এটি performance photograph নয়, post-show interaction-এর স্মৃতিগণেশ চতুর্থীর
সন্ধ্যা। চারদিকে উৎসবের আবহ, আলো,
ভক্তি এবং আনন্দ। সেই সন্ধ্যায় নান্দীকারের পঞ্চাজন্য দেখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল, কখনও
কখনও মঞ্চ আমাদের এমন কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় যার উত্তর হল থেকে বেরোনোর
সময় পাওয়া যায় না। পার্থপ্রতিম দেবের লেখা এবং সোহিনী সেনগুপ্তের নির্দেশনায় পঞ্চাজন্য মহাভারতের চেনা কৃষ্ণকে একেবারে অন্য জায়গা থেকে দেখতে শেখায়।
আমরা কৃষ্ণকে
সাধারণত নানা পরিচয়ে মনে রাখি—বৃন্দাবনের কৃষ্ণ, রাধার কৃষ্ণ, বাঁশিওয়ালা
কৃষ্ণ, গীতার উপদেশদাতা কৃষ্ণ, কুরুক্ষেত্রের সারথি কৃষ্ণ। কিন্তু পঞ্চাজন্য তাঁর আর-একটি পরিচয়কে সামনে আনে। তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক, যাঁকে বারবার ব্যক্তিগত অনুভূতির উপর বৃহত্তর
দায়িত্বকে বেছে নিতে হয়েছে। নাটকটির প্রকাশিত বর্ণনাতেও রাষ্ট্রের প্রতি দায় এবং
মানুষের প্রতি দায়ের দ্বন্দ্ব এবং একজন দায়িত্বশীল মানুষ আদৌ কতটা নিজের জীবন
নিজের মতো করে বেছে নিতে পারেন—এই প্রশ্নগুলি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
এই প্রশ্নটিই
আমার কাছে নাটকের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা।
কৃষ্ণ কি
সত্যিই স্বাধীন ছিলেন?
যে মানুষটিকে
আমরা সর্বশক্তিমান ভাবি, তাঁর
নিজের জীবনে কি আদৌ নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার অধিকার ছিল?
কুরুক্ষেত্রের
যুদ্ধ শেষ হয়েছে। গান্ধারীর শত পুত্র মৃত। তাঁর শোক, ক্ষোভ এবং অভিশাপ এসে আছড়ে পড়ে কৃষ্ণের উপর। কেন কৃষ্ণ যুদ্ধ থামালেন
না? কেন তিনি এমন একটি পথে মানুষকে যেতে
দিলেন যার পরিণতি হল রক্ত, মৃত্যু
এবং ধ্বংস? কিন্তু নাটকটি
শুধু কৃষ্ণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বিচার করে থেমে থাকে না। এটি তাঁর জীবনের দিকে
ফিরে তাকায় এবং দেখায়, যে মানুষটি
অন্যের জন্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তাঁকেই বারবার নিজের ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিতে হয়েছে।
এখানেই কৃষ্ণ
আমাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
রাষ্ট্রের
প্রতি দায়, নাকি মানুষের
প্রতি দায়—কোনটি বড়? এই প্রশ্নটি
শুধু কৃষ্ণের নয়। আজকের মানুষেরও। আজও কত মানুষ দায়িত্বের নামে নিজের ইচ্ছাকে
সরিয়ে রাখেন। পরিবার, পেশা, সম্পর্ক, সমাজ—সবকিছুর
প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের ভিতরের মানুষটিকে কোথাও রেখে আসেন। এই জায়গা থেকেই পঞ্চাজন্য-এর কৃষ্ণ আমার কাছে সমকালীন হয়ে ওঠেন।
পাঞ্চজন্য
নামটির অর্থ কী?
নাটকটির নামটি
নিয়েও একটু জানা দরকার, কারণ পঞ্চাজন্য শুধু একটি সুন্দর পৌরাণিক নাম নয়; এর সঙ্গে কৃষ্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় জড়িয়ে আছে।
পাঞ্চজন্য হল
কৃষ্ণের শঙ্খ। ভগবদ্গীতা-র
প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সূচনায় কৃষ্ণের পাঞ্চজন্য
শঙ্খধ্বনির উল্লেখ রয়েছে। একই শ্লোকে অর্জুনের শঙ্খের নাম দেবদত্ত এবং ভীমের
শঙ্খের নাম পৌণ্ড্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঞ্চজন্য
নামটির সঙ্গে পাঞ্চজন নামে এক অসুরের কাহিনিও যুক্ত। প্রচলিত পুরাণকথার একটি
গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণে বলা হয়, গুরু
সন্দীপনির পুত্রকে উদ্ধারের জন্য কৃষ্ণ সমুদ্রের গভীরে যান এবং সেখানে পাঞ্চজনকে
বধ করেন। তার কাছ থেকেই তিনি শঙ্খটি লাভ করেন, যার নাম হয় পাঞ্চজন্য। অর্থাৎ শঙ্খটির সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত রয়েছে
উদ্ধার, কর্তব্য এবং সংগ্রামের একটি কাহিনি।
কুরুক্ষেত্রে
সেই শঙ্খধ্বনি যুদ্ধের সূচনার ঘোষণা হয়ে ওঠে। কিন্তু পঞ্চাজন্য দেখে আমার মনে হয়েছে, এই
শঙ্খের অর্থকে আরও ব্যক্তিগতভাবে পড়া যায়। শঙ্খ যেন কৃষ্ণের উপর এসে পড়া সেই
কর্তব্যের ডাক, যেখান থেকে
তিনি সরে যেতে পারেন না।
এখানে কৃষ্ণের
বাঁশি এবং পাঞ্চজন্যকে পাশাপাশি রাখলে নাটকের মানবিক দিকটি আরও স্পষ্ট হয়। বাঁশির
সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃন্দাবন, রাধা,
প্রেম এবং ব্যক্তিগত আনন্দের পৃথিবী; পাঞ্চজন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, রাষ্ট্র, ধর্ম
এবং দায়িত্ব। একদিকে হৃদয়ের ডাক, অন্যদিকে
কর্তব্যের আহ্বান। আর কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে আছেন এই দুইয়ের মাঝখানে।
এই জায়গাটিই
আমার কাছে নাটকের সবচেয়ে বেদনাময় সৌন্দর্য।
রাধা, গান্ধারী এবং একাকী কৃষ্ণ
রাধার উপস্থিতি
তাই আমার কাছে শুধু হারিয়ে যাওয়া প্রেমের স্মৃতি নয়। রাধা যেন কৃষ্ণের সেই জীবন,
যেখানে তাঁকে রাষ্ট্রনায়ক হতে হয়নি, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়নি, মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়নি। সেখানে ছিল
শুধু অনুভব। কৃষ্ণ যত দূরে সরে যান সেই পৃথিবী থেকে, ততই তাঁর ভিতরের মানুষটির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে
গান্ধারী কৃষ্ণের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন। তিনি শুধু শোকাহত মা
নন; তাঁর ক্রোধের মধ্যে রয়েছে নৈতিক
বিচারের দাবিও। তাঁর সামনে কৃষ্ণকে দাঁড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়।
“তুমি জানতেই, তবু কেন?”—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। আর আমার মনে হয়েছে,
নাটকটির শক্তি এখানেই যে এটি সেই প্রশ্নের একটি
সুবিধাজনক উত্তর দিয়ে বিষয়টিকে শেষ করে দেয় না।
আমরা সাধারণত
ঈশ্বরকে প্রশ্ন করি না। পঞ্চাজন্য বরং
ঈশ্বরকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আর তখন কৃষ্ণকে আর দূরের কোনও অলৌকিক সত্তা মনে
হয় না। তিনি হয়ে ওঠেন এমন একজন মানুষ, যিনি
সকলের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু নিজের
পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে হয়তো শেষ পর্যন্ত পাননি।
এই একাকিত্বই
আমার কাছে কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
তিনি
সর্বশক্তিমান, কিন্তু তবু
অসহায়। কারণ ক্ষমতা থাকা আর নিজের জীবন নিজের মতো করে বেছে নেওয়া এক জিনিস নয়। বরং
অনেক সময় ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গাটি
আরও সংকুচিত হয়।
অভিনয়, সংগীত এবং মঞ্চনির্মাণ
নান্দীকারের
দলগত অভিনয়ের শক্তি পঞ্চাজন্য-তেও
যথেষ্ট অনুভব করেছি। কৃষ্ণের বিভিন্ন বয়সের রূপ, গান্ধারীর শোক, রাধার
উপস্থিতি, সমবেত শরীরী অভিনয়, সংগীত এবং মঞ্চনির্মাণ মিলিয়ে একটি বৃহৎ
মহাকাব্যিক আবহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংগীত নাটকের পৌরাণিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ
করেছে এবং বিভিন্ন চরিত্র ও সময়ের মধ্যে একটি আবেগের সেতু তৈরি করেছে।
তবে একটি
ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণও আছে। নাটকের ভাবনার ঘনত্ব এবং ব্যাপ্তির কারণে কিছু জায়গায়
গতি আমার কাছে সামান্য ভারী লেগেছে। যাঁরা খুব দ্রুতগতির সমকালীন নাটকে অভ্যস্ত,
তাঁদের কাছে এই দীর্ঘতা আরও বেশি অনুভূত হতে
পারে। আমার কাছে অবশ্য এই দীর্ঘতার মধ্যেও একটি সার্থকতা ছিল, কারণ পঞ্চাজন্য এমন
নাটক নয় যাকে শুধু দ্রুত দেখে তার পরের মুহূর্তে ভুলে যাওয়া যায়। এর কিছু প্রশ্ন
ধীরে ধীরে ভিতরে কাজ করে।
দুটি নাটক,
একটি অদৃশ্য সংলাপ
এখন পিছন ফিরে
তাকালে মনে হয়, ১৬ আগস্টের অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ এবং ১৪
সেপ্টেম্বরের পঞ্চাজন্য যেন অজান্তেই একটি দীর্ঘ কথোপকথন তৈরি করেছে।
প্রথম নাটকটি
আমাকে ভাবিয়েছে, একজন তরুণ
মানুষকে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার কতটা স্বাধীনতা দেওয়া হয়। দ্বিতীয়টি দেখিয়েছে,
সেই স্বাধীনতা যদি কোনও একদিন দায়িত্বের বিশাল
ভারের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন কী
ঘটে। প্রথমটিতে পরিবার, শিক্ষা এবং
সমাজের প্রত্যাশা একজন মানুষের নিজস্ব কণ্ঠকে চাপা দিতে পারে। দ্বিতীয়টিতে রাষ্ট্র,
ধর্ম এবং ইতিহাসের দায়িত্ব একজন মানুষের
ব্যক্তিগত কণ্ঠকে পিছনে সরিয়ে দিতে পারে।
একটিতে
প্রশ্নটি একজন ছাত্রের।
অন্যটিতে একজন
দেবতার।
কিন্তু শেষ
পর্যন্ত দুজনের জায়গাতেই মানুষটি একই—সে নিজের মতো করে বাঁচতে চায়।
এই কারণেই দুটি
নাটক আমার মনে পাশাপাশি থেকে গেছে।
অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ আমাকে মনে করিয়েছে, কোনও তরুণের প্রশ্নকে খুব সহজে অবাঞ্ছিত বলে সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আর পঞ্চাজন্য মনে করিয়েছে, জীবনে
এমন দায়িত্বও আসে যার সামনে নিজের ইচ্ছাকে পিছিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু সেই ত্যাগের
মূল্যও আছে। কর্তব্য পালন করতে করতে মানুষ তার নিজের কোনও অংশ হারিয়ে ফেলতে পারে।
১৪ সেপ্টেম্বর
রাতে নাটক শেষ হওয়ার পর আমার মনে কৃষ্ণের চেহারার চেয়ে বেশি থেকে গেল তাঁর দ্বিধা।
থেকে গেল গান্ধারীর প্রশ্ন, রাধার
নীরবতা এবং সেই মানুষটির কথা, যিনি
পৃথিবীকে ধর্মের পথ দেখালেন, কিন্তু
নিজের জীবনে কতটা সুখ পেলেন।
গণেশ চতুর্থীর
দিনে পঞ্চাজন্য দেখা তাই আমার কাছে আরও একটি অর্থ পেয়েছিল। গণেশকে আমরা বিঘ্নহর্তা
বলে মানি। অথচ নাটকটি যেন আর-এক ধরনের বিঘ্নের কথা মনে করিয়ে দিল—মানুষের নিজের
ভিতরের বিঘ্ন। আমরা কি সত্যিই নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচি, নাকি পরিবার, সমাজ, পেশা, সম্পর্ক কিংবা পরিস্থিতির কৃষ্ণ হয়ে উঠি, অন্যদের পথ দেখাতে গিয়ে নিজের পথটি হারিয়ে ফেলি?
শেষ পর্যন্ত
হয়তো অবাঞ্ছিত
শব্দগুচ্ছ এবং পঞ্চাজন্য দুদিক
থেকে একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়। একটি বলে নিজের কণ্ঠকে চিনতে শেখো; অন্যটি মনে করিয়ে দেয়, কর্তব্যের শব্দের ভিতরেও নিজের হৃদয়ের শব্দ থাকে। একটিতে মুক্ত
চিন্তার দাবি, অন্যটিতে
দায়িত্বের অমোঘ ডাক। আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ—তার ইচ্ছা, তার ভালোবাসা, তার দায়িত্ব, তার
দ্বিধা এবং তার অপূর্ণ জীবন।
নাটক শেষ হয়ে
যায়, আলো নিভে যায়, দর্শক হল থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ভালো নাটক বোধহয় সেখানেই শেষ হয় না।
কিছু দৃশ্য মনে থাকে, কিছু চরিত্র
সঙ্গে হাঁটে, কিছু প্রশ্ন
বাড়ি পর্যন্ত আসে। নান্দীকারের এই দুটি নাটক আমার কাছে তেমনই দুটি অভিজ্ঞতা হয়ে
রইল—একটির অবাঞ্ছিত বলে চিহ্নিত শব্দগুলি এবং অন্যটির পাঞ্চজন্যের শঙ্খধ্বনি,
দুটিই এখনও কোথাও ভিতরে বাজছে।
হয়তো কৃষ্ণের
সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কুরুক্ষেত্রে ছিল না।
হয়তো ছিল তাঁর
নিজের ভিতরে।
আর হয়তো আমাদের
প্রত্যেকের জীবনেও এমন একটি যুদ্ধ কোনও না কোনও সময়ে এসে দাঁড়ায়।
📚 পাঠকের জন্য
যাঁরা পঞ্চাজন্য-এর পৌরাণিক ও দার্শনিক পটভূমি আরও জানতে চান, তাঁদের জন্য মহাভারত, ভগবদ্গীতা বা কৃষ্ণকে নিয়ে ভালো বই:-
1. শ্রীমদভগবদ্গীতা যথার্থ (Bhagavad Gita As It Is) শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের একটি বিখ্যাত অনুদিত গ্রন্থ। এর প্রথম অধ্যায়ের ১৫ নম্বর শ্লোকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীমের শঙ্খ বাজানোর বর্ণনা রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর 'পাঁচজন্য', অর্জুন 'দেবদত্ত' এবং ভীম 'পৌণ্ড্র' নামক মহাশঙ্খ বাজান। এই শঙ্খধ্বনি কৌরবদের মনে ভয় ও বিপদের বার্তা সঞ্চার করেছিল, যা নির্দেশ করে যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি এবং ধর্মের পক্ষই জয়ী হবে।
2. কৃষ্ণচরিত্র (Krishna Charitra): বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত এটি একটি ক্লাসিক বাংলা সাহিত্য। এখানে শ্রীকৃষ্ণকে কেবল অলৌকিক দেবতা হিসেবে নয়, বরং একজন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং শ্রেষ্ঠ আদর্শ মানব চরিত্র হিসেবে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয়েছে।
ব্যাসদেবের মূল মহাভারতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সাবলীল বাংলা অনুবাদ বা সারসংক্ষেপ করেছেন রাজশেখর বসু (পরশুরাম)। যারা জটিল শ্লোক এড়িয়ে মূল গল্প এবং তার পেছনের পটভূমি সহজ বাংলায় উপভোগ করতে চান, তাঁরা Rajsekhar Bose Mahabharat এর কালেকশনটি দেখতে পারেন।লেখক পরিচিতি
সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় কলকাতার একজন ভারতীয় লেখক এবং আর্মি পাবলিক স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষিকা। তাঁর লেখায় শ্রম, সংগ্রাম, স্থিতিস্থাপকতা এবং মানুষের অন্তর্লীন কোমলতার নানা দিক উঠে আসে। জীবনের বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের নীরব জটিলতা এবং সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি গল্প খুঁজে নেন।
শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষিত সুস্মিতার পেশাগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আইটি শিক্ষা, কর্পোরেট যোগাযোগ, আতিথেয়তা শিক্ষা এবং কাউন্সেলিং ও সমন্বয়মূলক কাজ। তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে Indian Literature (Sahitya Akademi), Muse India, Intrepidus Ink, Flash Fiction Magazine, Fractured Lit, Sky Island Journal, Nanum Magazine, BULL Lit Mag, Kitaab, Setu, Epistemic Literary Magazine, Gulmohur Quarterly, Fictive Dream, Literally Stories, Literary Yard, Shabdodweep Web Magazine-সহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যপত্রিকায়।
Flash Fiction Magazine-এর একটি প্রতিযোগিতায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। এছাড়া Inkspot Story Competition 2025–26 এবং 3 Minute Arts Story Writing Competition 2025–26-এও তিনি দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ When the Earth Sang of Us: A Meditation on Love, Life and Nature বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত ও উপলব্ধ। কবিতা ও ছোটগল্পের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য, নাটক, সংগীত, সিনেমা এবং ভ্রমণ নিয়ে লেখেন।
Follow Susmita Mukherjee
· X
· Facebook


0 Comments